স্কুলে গান নিষিদ্ধ, আমরা কি তবে তোতাপাখি তৈরির কারখানায় ফিরছি?

যে দেশে শিশুদের হাসি, গান, ছুটোছুটি, মাঠে দৌড়ানো, শারীরিক খেলাধুলা এই সবকিছুর ওপর ভর করে ভবিষ্যৎ দাঁড়িয়ে থাকার কথা, সেই দেশ আজ খুব ঠাণ্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত আর শরীরচর্চার শিক্ষক লাগবে না। ২০২৫ সালের আগস্টে সরকার একটা নতুন নিয়োগবিধি করে জানাল, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫,১৬৬ জন সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক নিয়োগ দেবে, যাতে শিশুরা পড়ালেখার পাশাপাশি গান, সুর, তাল আর খেলাধুলার মাধ্যমে বড় হতে পারে। কিন্তু , অন্তর্বর্তী সরকার সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিল মন্ত্রণালয় নতুন গেজেট জারি করল, চার ধরনের সহকারী শিক্ষকের তালিকা থেকে সংগীত আর শারীরিক শিক্ষার পদ বাদ, এখন শুধু সাধারণ ও ধর্মীয় শিক্ষক থাকবে। কারণ? ইসলামি দলগুলো রেগে গেছে, বলেছে “মিউজিক-নাচ শেখানো অনৈসলামিক”, “এটা নাকি নাস্তিক এজেন্ডা”, “শুধু ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে, না হলে ‘ইসলামপ্রেমী জনতা’ রাস্তায় নেমে আসবে।”

ইন্টারিম সরকার প্রথমে বলল, এটা নাকি “প্রশাসনিক সমন্বয়”, “প্রজেক্ট ডিজাইনে ভুল সংশোধন”, কিন্তু আন্তর্জাতিক ও দেশীয় মিডিয়া থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র, সাংস্কৃতিক কর্মী সবাই খুব পরিষ্কার ভাষায় বলল এটা আসলে মৌলবাদীদের চাপের কাছে একেবারে নগ্ন আত্মসমর্পণ। The Diplomat, এএফপি, বিভিন্ন রিপোর্টে খুব স্পষ্টভাবে লেখা আছে, হেফাজতে ইসলাম, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিশসহ একাধিক ধর্মীয় সংগঠন মাসের পর মাস ধরে সভা-সমাবেশ করেছে, হুমকি দিয়েছে, “মিউজিক আর ফিজিক্যাল এডুকেশন শিক্ষক নিয়োগ মানে নাকি বাচ্চাদের চরিত্রহীন করা, ধর্মহীন করা, নাস্তিক বানানো।” আদতে তারা চাইছিল, স্কুলে যেন ধর্মীয় শিক্ষকের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকে গান, খেলাধুলা, নাটক, ছবি আঁকা এই সব ‘অপ্রয়োজনীয়’ জিনিস বাদ দিয়ে শুধু ‘আখেরাতবান্ধব’ সিলেবাস চলে।

আমি যখন ছোট ছিলাম, আমাদের স্কুলে একটা বুড়ো হারমোনিয়াম ছিল, অল্প ক’টা গানের বই, সামনে দাঁড়িয়ে স্যার গলা কাঁপিয়ে গান ধরতেন, “সবার উপরে মানুষ সত্য”, “ও আমার দেশের মাটি”, এইসব। সেই গানের সময়টুকু ছিল সাপ্তাহিক বিরতির মতো কেউ সুর ঠিকমতো ধরতে পারত না, কেউ জোরে গাইত, কেউ ঠোঁট নাড়াত না তবু সবাই একসাথে গলা মিলিয়ে একটা অনুভূতি পেত যে আমরা বইয়ের অক্ষর ছাড়াও কিছু শিখছি। প্রাথমিক স্তরে আমরা যারা গ্রাম থেকে উঠে এসেছি, তাদের জন্য শরীরচর্চার ক্লাসও ছিল আশীর্বাদ মাঠে দাঁড়িয়ে শ্বাস নেওয়া, হাত পা নাড়ানো, একটা বলের পেছনে দৌড়ানো। এখন সেইসব জায়গা ধীরে ধীরে খালি হয়ে যাচ্ছে, আর মসজিদের মাইকে গর্জন বাড়ছে, ওয়াজিনরা মঞ্চে উঠে বলছে, “মেয়েদের খেলাধুলা হারাম, গান শয়তানের কাজ, নাচ নাস্তিকের কাজ।” সরকার এই ভাষার সামনে হাঁটু মুড়ে বলছে, “আচ্ছা, তবে আমরা গান-খেলা বাদ দিলাম।”

সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টগুলো খুলে তাকালে মনের মধ্যে এক অদ্ভুত শূন্যতা জন্মায়। এএফপি-র রিপোর্ট বলছে, এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, “সরকার সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে, নতুন আদেশ দিয়েছে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক পদের প্রয়োজন নেই।” ইন্ডিয়া টুডে, ফার্স্টপোস্ট, WION, আরও কত জায়গায় লেখা হচ্ছে, “ইউনুস সরকারের এই সিদ্ধান্ত তালেবানি ধাঁচের, যেখানে ধর্মীয় উগ্রদের হুমকির সামনে রাষ্ট্রের মাথা নত।” একই সাথে ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে, সংগীত বিভাগ আর ছাত্র সংগঠনগুলো মানববন্ধন করেছে, বলেছে, “এটা শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত, সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের অংশ, যার মাধ্যমে শিশুদের শুধু পরীক্ষার নম্বর আর ধর্মীয় আজ্ঞাবহ হয়ে ওঠার যন্ত্র বানানো হচ্ছে।”

একজন bisexual নারী হিসেবে নিজের শৈশবের দিকে তাকালে দেখি, বেঁচে থাকার অনেকটা জোরই এসেছে গান, কবিতা, চিত্রকলা, বইয়ের ভেতরের অন্য জগত থেকে। যখন বাড়িতে, সমাজে, মসজিদে, টিভির ওয়াজে শুনেছি আমার মতো মানুষ নাকি “বিপথগামী”, “গোনাহগার”, “নরকের ইন্ধন”, তখন বাংলা গান, কবিতা, গল্পই আমাকে শিখিয়েছে অন্যরকম মানুষ হওয়া মানে অপরাধ না, বরং ভিন্নভাবে বেঁচে থাকার একটা সম্ভাবনা। আজ যদি সেই গান আর ছবি আঁকার বীজ প্রাথমিক স্তর থেকেই তুলে নেওয়া হয়, তাহলে নতুন প্রজন্মের একটা বড় অংশ এমনিতেই কখনো জানবে না, ভিন্ন হওয়ার স্বপ্ন দেখতে কেমন লাগে। শুধু কিতাবি জ্ঞান আর মোল্লার বয়ান শুনে বড় হলে তারা খুব সহজেই মবের অংশ হয়ে যেতে পারবে যেখানে কোনো প্রশ্ন নেই, শুধু স্লোগান আছে।

সরকার বলেছে, নাকি “প্রজেক্ট ডিজাইন” খুঁত খুঁজে এই সিদ্ধান্ত, কিন্তু নিজস্ব আর আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণগুলো খুব পরিষ্কারভাবে বলছে, এটা আসলে একটা রাজনৈতিক সমঝোতা। The Diplomat-এর লেখক লিখছেন, “ধর্মীয় সংগঠনগুলো বারবার দাবি করেছে, সংগীত শিক্ষা ইসলামী মূল্যবোধের বিরোধী, তাই স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষক রাখো, মিউজিক ও পিই শিক্ষক বাদ দাও। সরকারের সিদ্ধান্তের সময় আর প্রেক্ষাপট দেখে মনে হচ্ছে, প্রশাসনিক ভাষার পেছনে লুকিয়ে আছে মৌলবাদীদের চাপ মেনে নেওয়া।” মানে এই, আমাদের শিশুর মাথার ভেতরে কি ঢুকবে, সেটা এখন নির্ধারণ করবে এমন কিছু লোক, যারা বিশ্বাস করে গিটার ধরা ছেলেমেয়ে একসময় নাস্তিক হয়ে যাবে, আর ফুটবল খেলতে গিয়ে মেয়েদের হাঁটু দেখা গেলে ঈমান চলে যাবে।

আমি প্রায়ই ভাবি, এই দেশে কি আমরা আবার সেই পুরোনো তোতাপাখি তৈরির কারখানায় ফিরছি? যেখানে শিশুর কাজ হবে শুধু মুখস্ত করা ক’টা সূরা, ক’টা গাণিতিক সূত্র, ক’টা দেশের নাম কিন্তু তাদের মন, কল্পনা, প্রশ্ন করার ক্ষমতা, সৃজনশীলতা এসব চুপচাপ কেটে ফেলা হবে। বিশ্বব্যাপী গবেষণা বলে, প্রাথমিক স্তরে সংগীত আর শারীরিক শিক্ষা থাকলে শিশুরা বেশি মনোযোগী, বেশি সহযোগিতাপ্রবণ, কম সহিংস হয়, তাদের সামাজিক দক্ষতা বাড়ে, মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ একসাথে সক্রিয় থাকে। বাংলাদেশের শিক্ষক আর বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যেও একই কথা তারা বলছেন, “গান আর খেলাধুলার জায়গা সরিয়ে দিলে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হবে, ওদের স্কুল ধীরে ধীরে কেবল পরীক্ষার হুলুস্থুলে আর ধর্মীয় অন্ধ আনুগত্যের ঘরে পরিণত হবে।”

যারা আজকে বলছে, “মিউজিক শিক্ষক না থাকলেই বা কী, বাচ্চারা তো ইউটিউবেও গান শুনতে পারে”, তারা আসলে বোঝে না, সংগীত শিক্ষা আর ইউটিউবে প্লেলিস্ট শোনা এক জিনিস না। ক্লাসরুমে গান মানে একসাথে দাঁড়িয়ে গলা মেলানো, তাল ধরার চেষ্টা, লজ্জা কাটিয়ে ওঠা, অন্যদের শুনতে শেখা, একসাথে কোরাস তৈরি করা এই সবকিছুর ভেতর দিয়ে মানুষ হওয়ার একটা প্রাথমিক পাঠ। আর শরীরচর্চার ক্লাস মানে শুধুই পিটি না, বরং নিজের শরীরকে চেনা, শক্তি আর সীমা বুঝে নেওয়া, দলগত খেলার ভেতর দিয়ে সহযোগিতার নিয়ম শেখা। এগুলোর জায়গায় যদি কেবল ধর্মীয় পাঠ, ফতোয়া, ‘হারাম-হালাল’ আর পরীক্ষার নম্বর ঢুকে যায়, তাহলে আমরা কী ধরনের মানুষ তৈরি করছি? আজকের এই সিদ্ধান্তের ভেতরে আমি দেখি, ভবিষ্যতের এক দল ছেলে-মেয়ে, যারা ভিন্ন কোনো গান শুনলেই ‘শিরক’, মেয়ে খেলতে নামলেই ‘ফিতনা’, অন্য ধর্মের উৎসব দেখলেই ‘হারাম’ বলে চিৎকার করবে।

ইউনিভার্সিটির এক সংগীত শিক্ষক বলেছেন, “সভ্যতা টিকে থাকে শিল্প-সাহিত্য-সংগীতের ওপর, আর আমরা সেই শিকড়টাই কেটে দিচ্ছি।” জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনের নেতা বলেছেন, “এই সিদ্ধান্ত সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের অংশ, যেখানে রাষ্ট্র বাজার আর ধর্মের হাতে শিক্ষাকে ছেড়ে দিচ্ছে, চিন্তা আর সৃজনশীলতার দরজা বন্ধ হচ্ছে।” এই ভাষা আমার নিজেরও একজন উভকামী নাস্তিক নারী হিসেবে জানি, গান আর শিল্পকে হত্যা করা মানে শুধু বিনোদন কেড়ে নেওয়া না, মানে প্রশ্ন তোলার আর ভালোবাসার ভাষাকে হত্যা করা। যে বাচ্চাটা আজ স্কুলে গিটার ধরতে পারছে না, কাল সে হয়তো সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ব্লাসফেমি’ তকমায় আক্রান্ত কাউকে পেটাতে মবের সাথে দৌড়াবে, কারণ তারা কখনো শিখতেই পারেনি, মানুষের ভিন্নতাকে রঙের মতো, সুরের মতো, গল্পের মতো দেখার শিক্ষা।

আমরা কি সত্যি বুঝতে পারছি না, এই শিশুদের আমরা আসলে কী বানাচ্ছি? পাঠ্যবইয়ে মুখস্থ আর গড়গড় করে পড়ার বাইরে যদি আর কিছু না থাকে, স্কুল যদি হাফেজ বানানোর কারখানা আর চাকরি পরীক্ষার ট্রেনিং সেন্টার হয়ে যায়, তাহলে একটা সময় পরে আমাদের সমাজে শুধু দুই ধরনের মানুষ থাকবে একদল অন্ধ আনুগত্যে বিশ্বাসী ধর্মান্ধ, আরেক দল নিঃস্ব, ক্লান্ত, প্রশ্নহীন কর্মী। এই দুই দলের কোথাও থাকবে না সৃষ্টিশীল, প্রশ্নবোধসম্পন্ন, বহুমাত্রিক মানুষ যে হয়তো একদিন যৌনতার ভিন্নতা নিয়ে, ধর্মের অনুপস্থিতি নিয়ে, নারীর স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলবে। আর তাই অন্তর্বর্তী সরকারের এই সিদ্ধান্ত, শুধু একটা নিয়োগ বাতিল না এটা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রশ্নকারী প্রজন্মের গলা টিপে ধরার শুরু যেখানে শিশুদের মননকে সংকুচিত করে কেবল রোবট বা তোতাপাখি বানানোর প্রক্রিয়া চলছে, আর আমরা চুপচাপ দেখছি।