আইসিসের আন্তর্জাতিকীকরণ

muslim militants

আপনার বিপন্ন বিস্ময় দেখে জিভাগো নামের সেই কবি ও চিকিৎসকের কথা মনে পড়লো, আপনিও তার মতই ভাবছেন– আমিতো সেই লুটেরা না যে এই অবস্থার জন্য দায়ী। আমিতো সেই হতভাগা সর্বহারাও না, যার ঘৃনা সাম্রাজ্যে আগুন দিচ্ছে। তাহলে এই সব ঘটনাপ্রবাহ, এইসব আগুন কেন আমাকেও ছারখার করবে, আমি তো এদের কেউ না, আমি কেন শিকার হবো!

কোমল নরম নিরাপদ মধ্যজীবীকে কি যে বিপদে ফেলে দিলো দুনিয়ার ঘূর্নাবর্ত। কিন্তু উগড়ে দেয়া ঘৃণাও লাভাপ্রবাহ কি ঘৃনার বাদশাহীকেই আরও যৌক্তিক করবে না? ফ্রান্সের এই ভয়াবহ নারকীয় ঘটনার শিকার হয়েছেন সাধারণ মানুষ, যাদের হৃদয় আরও ঘৃনায় আচ্ছন্ন হয়েছে মুসলমানদের প্রতি, কিংবা সাধারণভাবে বিদেশীদের প্রতি তারাও সাধারণ মানুষ। ইউরোপ জুড়ে ডানপন্থী উত্থানের বাস্তবতাকে আরও শক্তিশালী করবে এই ঘৃণার উদ্‌গীরণ।

যে কোন মানবতা বিরোধী অপরাধের তাৎক্ষণিক প্রতিকার হলো শাস্তি। কিন্তু সকল শাস্তি যখন ব্যর্থ হয় অপরাধ দমনে, তখনও কি আমরা ভাববো না, সাধারণ ব্যক্তিগত অপরাধের সাথে এই সকল অপরাধের একটা ভয়াবহ প্রভেদ আছে? উত্তর আফ্রিকা জুড়ে ফরাসিরা যে উপনিবেশিক শাসন চালিয়েছিলো, তার ঐতিহাসিক জেরই শুধু না, এই দেশগুলোতে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে আজও যে নয়া উপনিবেশিক বাস্তবতা বিরাজ করছে, যে বাস্তবতা ফরাসিদেশে সস্তা শ্রমিকের জোগানদার; যে বাস্তবতা ফ্রান্সের নগরে নগরে তৈরি করেছে নোংরা কর্দমাক্ত অভিবাসী শিবির; যে অভিবাসী নীতির বড় লক্ষ্য নিজ দেশে শ্রমিক আন্দোলনকে সস্তা শ্রমের প্রতিযোগিতায় আটকে রেখে মুনাফা সর্বোচ্চ করা; তার মাঝে কি এই ঘটনার কোন বীজ নেই?

আইসিসের আন্তর্জাতিকীকরণ দিয়ে বিচার করলে তাই শুধু চলবে না, ফ্রান্সের অন্তর্গত বাস্তবতা দিয়েও একে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। গোটা পশ্চিম ইউরোপ ভবিষ্যতে এই সঙ্কটে পড়তে যাচ্ছে যেখানে জনগোষ্ঠী দুই না– তিন ভাগে বিভক্ত। ধনী, গরিব আর অভিবাসী। শেষ দুই ভাগের আত্মীয়তা না হলে গনতান্ত্রকি আন্দোলন হয় না, জন্ম নেয় পারস্পরিক ঘৃনা। শেষ দুই ভাগের আত্মীয়তা আর এক কালে মার্কিন কিংবা ইউরোপীয় জগতে নাগরিক অধিকার আন্দোলন আর গণতন্ত্র এনেছিল।

নাগরিক অধিকার আর গণতন্ত্র মানে মুনাফার ভাগে কম পড়া, নাগরিকদের দায় নিতে রাষ্ট্রের আরও বাধ্য হওয়া, সেটা ডানপন্থীরা খুব জানে। তাই সকল অর্থনৈতিক সঙ্কটের কালে তাদের অন্যতম বুলি হয় অভিবাসীদের বিরুদ্ধে আক্রমণ। যে যত বড় ডান, সে তত বড় অভিবাসীর অধিকারের বিরুদ্ধে। কিন্তু অভিবাসন কখনোই তারা বন্ধ করবে না, সেটা তো নিজের পায়ে কুড়াল মারার সামিল। আজকে যেটা মুসলমান সন্ত্রসের চেহারায় দেখা যাচ্ছে, কয়েক বছর আগেও ফ্রান্স জুড়ে পুলিশ-কালো দাঙ্গায় সেটার সত্যিকারের বাস্তবতা আরও প্রকট ভাবেই ফুটে উঠেছিল। সত্য যখন নিজের চেহারায় এসেছিল, তাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এবার দমিয়ে রাখা সত্য হাজির হয়েছে বিকৃত চেহারা নিয়ে।

কিন্তু শুধু বোমা মেরে কি এই ঘৃনাকে দমন করা যাবে? এমনকি জর্জ বুশের সন্ত্রসা বিরোধী যুদ্ধের মত, নিজ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মন্দাকে অতিক্রম করতে ইরাকে কিংবা আফগানিস্তানে যুদ্ধ শুরু করার মত প্রয়াসও আমরা দেখেছি। সেই যুদ্ধ তো আরও নতুন সব সন্ত্রাসের দাবানল জ্বালিয়েও শেষ হলো না। আইসিসের বাস্তব রাজত্ব ফরাসি কোন অভিযান ছাড়াই সম্ভব। এমনকি আইসিসের উত্থানও সম্ভব হতো না ফরাসিদেরও অতুৎসাহ ভূমিকা ছাড়া। কিন্তু অসুখের শুরুটা যে খোদ ফরাসি রাষ্ট্রের নিজের শরীরে, সেটার চিকিৎসা তো তারা করতে রাজি হবে না।

আইসিস রাজত্বের অনিবার্য পরিসমাপ্তি কি আল কায়েদা- তালেবানের পর দুনিয়াজুড়ে পশ্চিমাগর্ভজাত নতুন কোন কায়দার জন্ম দেবে, নাকি পশ্চিমের দেশে-দেশে গণতন্ত্রের লড়াই, শ্রমিক-ছাত্র-নারীর লড়াই নতুন করে শক্তিশালী হবারও যে লক্ষণ যেভাবে দেখা যাচ্ছে সেই পথেই হাঁটবে, অভিবাসী-নাগরিক যে যুদ্ধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়বে, এই দুই স্পষ্ট বিভাজিত সড়ক আমরা দেখতে পাচ্ছি।

সন্ত্রাসের শিকার সকল মানুষের প্রতি জানাই সহমর্মিতা, ভালবাসা। যুদ্ধে রত নন, এমন মানুষকে হত্যার চেয়ে বড় অপরাধ আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু সন্ত্রাসের এই অবিরল স্রোত বন্ধ করায় নাগারিকদের ভূমিকা পালন করার আছে আরও অনেক কিছু। সাম্রাজ্য আর বিভাজনের যে নীতির ওপর নিজেদের শিল্প-সাহিত্য-রাজনীতি-জীবন-উপভোযগ গড়ে উঠেছিল, তার সকল কিছুকেই নতুন করে বিবেচনায় আনারও যুগ শুরু হলো বলে।