ঈদে মিলাদুন্নবি ও অসময়ে আমার কোরবানিকথন

ঈদে মিলাদুন্নবিতে সুলেমান কাকা গরু শিরনির আয়োজন করিলেন। সে এক এলাহি কারবার। ভোর হইতে মানুষ গমগম করিতেছে। সারারাত হুজুরদের গলা ফাটাইয়া দরুদ পাঠ আর ওয়াজের ঠেলায় একটুও ঘুমাইতে পারি নাই, এদিকে সকাল হইতে না হইতেই এই কাণ্ড। শান্তিতে যে একটু বসিব, তাহারও জো নাই। এদিকে সুলেমান কাকার আশেপাশে না থাকিলে তিনি বড় রকমের শাস্তির ব্যবস্থাও করিতে পারেন ভাবিয়া মনটা থামিয়া থামিয়া কান্দিয়া উঠিতে থাকিল।
ঘটনা হইল, তাঁহার পিত্তথলিতে পাথর হইয়াছিল। বহু পানি-পড়া, তাবিজ-কবচ করিয়া যখন ব্যর্থ হইলেন তখন সৈয়দপুরের বড় হুজুর বলিলেন, বড়সড় দেখিয়া একটা গরু মান্নত করিতে। তিনি আল্যা-রচুলের নাম লইয়া তাহাই করিলেন। কিন্তু রোগ তো আর সারে না। শেষ পর্যন্ত ইহুদি-খ্রিস্টানদের শিক্ষায় শিক্ষিত বে-ঈমান ডাক্তারদের শরণাপন্ন হইলে তাঁহাকে অপারেশন করানোর জন্য বলা হইল। তিনি প্রথমে রাজি না হইলেও আমাদের সবার অনুরোধে ঢেঁকি গিলিলেন। তাঁহার অপারেশন হইল এবং রীতিমত তিনি সুস্থ হইয়া উঠিলেন। তাঁহার স্মরণ হইল, মান্নতের কথা। তিনি বলিয়া বেড়াইতে লাগিলেন, ডাক্তাররা তাঁহার পিত্ত কাটিয়া ফেলিয়াছে আর বড় হুজুরের দোয়ায় ও গরু-শিরনির বদৌলতে তিনি আরোগ্য লাভ করিয়াছেন। গরু শিরনির মান্নতের কারণে আল্যা খুশি হইয়া তাঁহার রোগ দূর করিয়া দিয়াছে। শুভ দিন দেখিয়া আজ ঈদে-মিলাদুন্নবিতে তাই তাঁহার এ আয়োজন।
অনেক মুচলমান মুহাম্মদের জন্ম ও মৃত্যু ঐ একদিনে ঘটিয়াছিল ধরিয়া নিয়া এইদিন মহা-আড়ম্বরে ঈদে-মিলাদুন্নবি পালন করিয়া থাকেন। কিন্তু আমি বিস্তর কিতাব ঘাঁটিয়া কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র পাইলাম না – হজরত ঠিক কোন দিন জন্মিয়াছিলেন বা মরিয়াছিলেন, স্যরি, ওফাত করিয়াছিলেন; চার-পাঁচটা তারিখ লইয়া হাতড়িয়া বেড়াইতে থাকিলাম- এদিকে মুমিন-মচলমানরা ঈমানের সহিত ওই দিন ঈদ পালন করিয়াই চলিয়াছেন। ঈমান থাকিলে আর ঘিলুর দরকার কী?
এই যে পশু উৎসর্গের ব্যাপারটা তাহা নিয়া কথা বলিতে গেলে কোরবানির কথা স্মরণ হইয়া যায়। এই জন্যই অসময়ে আমার এই কোরবানিকথন।
কোরবানি মানে হল উৎসর্গ করা। আমরা মুমিন-মসলমানরা আল্যাফাকের নামে কোরবানি দেই – প্রতি বছর কোরবানির ঈদ এলেই পশু জবাই করে রক্তে ভাসিয়ে দিয়ে প্রমাণ করি, কতটা ভয়াবহ ঈমান আমাদের রয়েছে। যাই হোক, এই যে পশু উৎসর্গ করার ব্যাপারটা,  এটি কিন্তু মূলত পৌত্তলিকদের ব্যাপারস্যাপার। তাদের কাছ থেকে ইব্রাহিম, মহাউন্মাদ সবাই ধার করেছেন।
ইচলামে শুধু পশু কোরবানি নয়, আরো অনেক প্যাগান উপাসনা রীতি অব্যাহত রয়েছে। কাবা ঘরের চারদিকে ইচলাম পূর্ব যুগের পৌত্তলিকেরা উলঙ্গ হয়ে ঘুরত- এটা অনুসরণ করে মুচলিম বন্ধুরা কাবার চারদিকে চক্কর দেন।
পাথর পূজার প্রচলন ছিল ইচলামপূর্ব যুগে, একে অনুকরণ করে পাথরকে চুম্বন করেন। এছাড়া শয়তানকে ঢিল ছোড়ার মত জিহাদি কাজ করতে গিয়ে ঈমানের ঠেলায় পদপিষ্ট হয়ে মারা যাওয়ার ব্যাপারটা হিসাবে নাই বা আনলাম (২০০৪ সালে ২৫০ ও ২০০৬ সালে ৩৬০ জন মারা গেছে এই কাজে। বুঝলেন, ঈমানের জোর কতটা মজবুত হতে পারে?)।
পৌত্তলিকেরা তাদের দেব দেবীর নামে, তাদেরকে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে কোরবানি দিত। বিশ্বের নানা জায়গায় দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে এই পশু-কোরবানির রীতি প্রচলিত ছিল, এমনকি এখনো আছে পুরোদমে। পৌত্তলিক গর্দভরা ভাবত, দেবতার নামে পশু-কোরবানি করলে উনি সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন। কিন্তু মুমিন-মুচলমানরা নাকি এতটা গর্দভ না। তাদের আল্যার নাকি কল্লা না থাকতে পারে, তবে ঘিলু আছে। কিন্তু একটা বিষয় বুঝি না, আল্যা যদি সন্তুষ্ট হতে চায়, তবে তার ব্যান্দাগো দিয়া পশু কোরবানি করাইয়া, এক মাস উপবাস রাইখা বা তাগোরে মসজিদে নিয়া মাটির মধ্যে কপাল ঠুকাইয়া সন্তুষ্ট হবেন কেন? তার সন্তুষ্ট হওয়ার এত শখ থাকলে তিনি তো ইচ্ছে করলে নিজে নিজে কোনো কারণ ছাড়াই সন্তুষ্ট হইয়া নিজ আরশে তাহার ফেরেশতাগো লইয়া ইচ্ছামতন মৌজ করতে পারেন। তারে কে বাধা দেয়?
আমি ভাবতে পারি, আল্যাফাকের ইচ্ছা হইল, তিনি সন্তুষ্ট হইবেন তার বান্দাদের উপর। রাম-রহিম মিল্ল্যা আল্যারে এমন গালি দিল, যা কেউ জনমেও শোনে নাই। আর আল্যাও তাতে এমন সন্তুষ্ট হইলেন যে, উদ্বাহু নৃত্যে আরশ ভাঙ্গিয়া ফালাইলেন। কেন, কারো গালিতেও তো ইচ্ছে করলেই উনি আনন্দিত হতে পারেন, আবার যেমনটি বলেছি বিনা কারণেই ইচ্ছে করলেই তিনি আনন্দিত বা তার ব্যান্দাদের প্রতি সন্তুষ্ট হতে পারেন, তাতে সমস্যা কী?
আর আমি ত্যাড়া চিন্তা করে অভ্যস্ত তো! ভাবছি, আল্যার মত অসীম ক্ষমতাবান, পরম করুণাময় সীমাহীন জ্ঞানীর কারো প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যাওয়া বা কারো উপর রেগে যাওয়া শোভা পায় কি না বা এটা তাকে মানব মনের কল্পনা হিসাবে প্রমাণ করে কি না। কেননা পশু হত্যা, মেঝেতে কপাল ঠুকানো, কাবার চারদিকে আধ-ধামড়ার মত ঘুরে বেড়ানো ইত্যাদিতে সন্তুষ্ট যে হয় সে আবাল ছাড়া আর কিছু না।
ও আচ্ছা, আগের যুগে প্যাগানরা দেব-দেবীর নামে কোরবানি দিয়ে পশুটা পুড়িয়ে ফেলত বা ফেলে দিত কিন্তু মুচলমানরা করে কি -কোরবানি দিয়ে নিজে নিজে আবার খেয়ে ফেলে। কেউবা আবার সারা বছরের আমিষের যোগান হিসাবে ডিপ-ফ্রিজে তা ঢুকিয়ে রাখে। এখন কথা হল: এইডা আবার উৎসর্গ হইল কেমতে? মানুষ যেমন নিজের মগজের সাথে রমণ করিয়া ঈশ্বরের জন্ম দিছে, তেমনি আবার সে ঈশ্বরকে নিয়া ঠাট্টা করতেও দ্বিধা করে নাই।
কোরবানির ঈদের কিছুদিন আগের কথা। ঘরে বসে টিভি দেখছিলাম। সামনে কোরবানির ঈদ, তাই স্বাভাবিকভাবেই কোরবানি নিয়ে মাতামাতি। এক চ্যানেলে দেখলাম, হুজুর বলছেন, কোরবানির মাধ্যমে আমরা মনের পশুকে কোরবানী দেব। আর এটাই কোরবানির আসল তাৎপর্য। বড়ই সৌন্দর্য!!
আচ্ছা, পশুদের মধ্যে খারাপ কি আছে? নির্মম অপরাধগুলোকে আমরা সাধারণত ‘পাশবিক’ বলে থাকি। কিন্তু পশুরা কি ইচ্ছে করলেও আমাদের মত নির্মম হতে পারবে? আমরা নিজেরাই নিজেদের সৃষ্টির সেরা ঘোষণা দিয়েছি। পশুদের সাথে আমাদের দূরত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে বিগত মাত্র কয়েক হাজার বছরে। মানুষ একসময় পশুদের মতই গর্তে বসবাস করত, অসহায় ছিল, মাছ-মাংস যা পেত, তা কাঁচা খেত, আগুন জ্বালাতে পারত না (শিকারী মানুষ পশুদের সাথে সংগ্রাম করেই জীবন কাটাত, যেখানে প্রায়ই তারা পশুদের সাথে হার মানতে বাধ্য হত। এখনো আমরা যদি সুন্দরবন বা গহীন কোনো বনাঞ্চলের মানুষের দিকে তাকাই, তবে দেখতে পাই পশুদের সাথে মানুষের সংগ্রামের চিত্র।) অর্থাৎ আমরা নিজেরাও পশু অবস্থা থেকেই মানুষ অবস্থায় এসেছি, যদিও উচু দালানে বসে তা কল্পনা করা বেশ দুরূহ। কিন্তু আমরা যদি দুর্দশাগ্রস্থ উপজাতিদের অবস্থা দেখি, বনে-জংগলে বসবাস করা মানুষদের দিকে তাকাই, অন্যান্য প্রাণীদের সাথে আমাদের জেনেটিক মিলের ব্যাপারটা বিবেচনায় আনি, তবে তা মেনে নিতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
যাই হোক, মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। আসুন আমরা কতটা খারাপ আর পশুরা কতটা খারাপ, তার একটা তুলনা করি এবং মনের পশুকে কোরবানি দেওয়ার আবশ্যিকতা বিবেচনায় আনি:
১। মানুষ কারণে-অকারণে নির্মম উপায়ে যত পশু হত্যা করেছে, কোনো পশু কি সেরকম করেছে? অন্য পশুরা নিজের খাদ্যের ও নিরাপত্তার প্রয়োজনে অন্য পশুকে হত্যা করে। কিন্তু আমরা মানুষেরা অত্যন্ত উদ্ভট ধর্মীয় বিশ্বাসের জন্য লক্ষ-লক্ষ পশুকে হত্যা করছি (কোরবানি, দেবতার উদ্দেশ্যে বলি ইত্যাদি)।
২। মানুষ কর্তৃক কত মানুষ এ পর্যন্ত নিহত হয়েছে, আর আন্যান্য পশু কর্তৃক কত মানুষ নিহত হয়েছে? গণহত্যা নামক ব্যাপারটা অন্য কোনো প্রাণীর মাঝে আছে কি?
৩। মানুষ কর্তৃক যে হারে মানুষ নিহত হয়, সে হারে অন্য কোনো প্রাণী কি স্ব-প্রজাতি কর্তৃক নিহত হয়? পশুরা কতটা হিরোশিমা-নাগাসাকি কাণ্ড ঘটিয়েছে?
৪। কোনো পশু কি মানুষের মত এতটা শৃংখলা ভংগ করেছে বা স্ব-প্রজাতীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে?
এভাবে তালিকা করলে বিশাল হয়ে যাবে। মূল প্রশ্নটা হল, পশু জিনিসটার মধ্যে এমন কী খারাপ গুণ আছে যে, উৎসব করে বর্বর উপায়ে পশু হত্যার মাধ্যমেই “মনের পশুকে” দূর করতে হবে?
বুঝলেন, ঈমানদাররা কখন কী ভাবে আর কখন কী করে, কোনো ঠিক নেই। মহা-মূল্যবান ঈমান টিকাইয়া রাখিতে নিজের মনের মাধুরী মিশাইয়া অতি মজাদার যুক্তি অন্বেষণে তাহাদের জুড়ি মিলা অসম্ভব। ইহাতে যে বিশ্বাস করিবে না, সে এক্ষুণি মরিয়া হাওয়ার সাথে মিলাইয়া যাক।
পরিশেষে, মুমিন-মুচলমানরা নাকি কোরবানি দেয় ইব্রাহিমকে অনুসরণ করে (ইব্রাহিমের আসল নাম কি ছিল, তা আল্যাফাকও নিশ্চিত নন, কারণ উহা বাইবেলে এক রকম বানান ও কোরানে আরেকরকম)। ইব্রাহিমের মাথায় ঘিলু যে কম ছিল, তাহা সম্যক বুঝিয়াছি। আমার সাথে থাকলে আপনারাও বুঝবেন। উনারে নাকি আল্যাফাক পরওয়ারদেগার আদেশ করিয়াছিলেন সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোরবানি করতে। উনি করলেন কি, উনার ছেলেকে কোরবানি দিতে নিয়া চইলা গেলেন (ইহুদি-খ্রেস্টানরা বলে ইব্রাহিম নাকি আইজ্যাক বা ইসহাকরে কোরবানি দিতে গিয়াছিলেন যার সাথে তাদের জাতির সম্পর্ক আছে। আর মুচলমানরা কয়, না, ইব্রাহিম আমাগোর মহাউন্মাদের পূর্বপুরুষ ইচমাঈলকে কোরবানি দিতে গিয়াছিলেন।
মুচলমানরা সব কিছু বেশি জানে, তারা এটাও বেশি জানে, খ্রেস্টানদের নবীকে কীভাবে আল্যাফাক উপরে উঠাইয়া নিয়া গিয়াছিলেন, যা খ্রেস্টানরা নিজেরাও জানে না। ইব্রাহিমের মাথায় তার ছেলেকে কোরবানি দেয়ার চিন্তা কেমতে আসিয়াছিল, তা ভাবিয়া খুঁজিয়া দেখিলাম, তখনকার যুগে নরবলির প্রচলন ছিল, অনেকে নিজ সন্তানকেও দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করত; আর ইব্রাহিম যতটা ভাবা হয় ততটা খাঁটি একেশ্বেরবাদী ছিলেন না (তিনি অনেক পৌত্তলিক প্রথায় বিশ্বাসী ছিলেন, কেনানে গিয়া মূর্তি পূজা শুরু করেন ইত্যাদি) যাই হোক, আমি ভাবতে চাই, ঘটনাটি এরকম ঘটেছিল:
আল্ল্যাফাক: হে ইব্রাহিম, তুমি আমার নামে তোমার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোরবানি দাও।
ইব্রাহিম: হে আল্যাফাক, পরওয়ার দেগার, তুমি তো জানো যে তুমিই আমার সব চেয়ে প্রিয় বস্তু। খাসির (বা দুম্বা যেইটা পছন্দ করেন) রুপ ধারণ করিয়া জমিনের মইধ্যে চইলা আহেন। আমি আদর করিয়া আপনারে জমিনে শোয়াইয়া আপনার নামে আপনারেই কোরবানি কইরা দেই। আল্যাহুফাকবার!!
আর এই ঘটনার স্মরণে আল্যা সুবহানাহু ওতাআ’লা প্রতি বছর কোরবানি ঈদের সময় জমিনে যতজন ঈমানদার ব্যান্দা রহিয়াছে, ততটি খাসির রূপ ধারণ করিয়া ধরণীতে চলিয়া আসিলেন আর মুমিন-মচলমানগণ তাহাকে ধরিয়া মনের সুখে তাহার নামেই কোরবানি করিয়া পরের বছর আবার কোরবানি করনের লাইগ্যা স্বস্থানে ফেরত পাঠাইল। চুভানাল্ল্যা!!! নিশ্চয়ই আল্যার জন্য কিছুই অসম্ভব নহে!!
কিন্তু যা আগে বললাম, ইব্রাহিমের ঘিলু কম ছিল (মুমিন মুচলমানদের ঘিলু কম থাকতে হয়, এ শিক্ষাও এখান থেকে আমরা পেতে পারি)। তাই তিনি এমনটি করেন নাই। আর এজন্যই মুমিন-মুচলমানরা পশু জবাই করিয়া রক্তে ভাসাইয়া তাদের ঈমানের জোর প্রদর্শন করিতে যাইয়াও কোনো কূল করিতে পারিতেছে না।